আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও শোষণ

 

 

আমরা চোখে যেটা দেখতে পাই সেটা হচ্ছে আলো। আমরা চোখে গাছপালা দেখি, আকাশ দেখি, চেয়ার-টেবিল দেখি ,মানুষ দেখি, তার মানে এই নয় যে গাছপালা, আকাশ, চেয়ার-টেবিল, কিংবা মানুষ হচ্ছে আলো এগুলো থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে সেই আলোটা আমাদের চোখে পড়ে। চোখের রেটিনা থেকে সেই আলো দিয়ে তৈরি সংকেত আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায় আর আমাদের মস্তিষ্ক বুঝতে পারে কোনটা গাছপালা কিংবা কোনটা মানুষ। পুরো ব্যপারটাই শুরু হয় চোখের মাঝে আলো ঢাকা থেকে। 

আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ। তরঙ্গ হলে তার একটা তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে। তার মানে আলোড়ন নিশ্চয়ই তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে। আমরা যারা পুকুরে ঢিল ছুড়ে কিংবা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তরঙ্গ তৈরি করেছি তারা জানে যে ইচ্ছে করলেই ছোট-বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি করা যায়। তাই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকতে পারে কথাটা সঠিক। বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যা কিছু হতে পারে! সেটা কয়েক কিলোমিটার থেকেও বেশি হতে পারে আবার এক মিটারে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ হতে পারে। যে বিষয়টা আমাদের ভালো করে জানা দরকার সেটি হচ্ছে এর সম্ভাব্য বিশাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ছোট্ট একটা অংশ আমরা দেখতে পাই। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এর থেকে বেশি হলেও আমরা দেখতে পাই না আবার এর থেকে ছোট হলেও আমরা দেখতে পাই না। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য 40 nm থেকে 70 nm এর ভেতরে হলে আমরা বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ দেখতে পাই এবং সেটা কে আমরা বলি আলো।

 আমরা যে চোখে নানান রং দেখতে পায় সেগুলো আসলে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট হয় সেটা হয় বেগুনি যখন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে তখন সেটা নীল সবুজ হলুদ লাল হয়ে চোখের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায় মানুষের চোখ এই ব্যাপ্তির বাইরে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দেখতে পারেনা কিন্তু পোকামাকর বা অন্য অনেক প্রাণী এর বাইরে ও দেখতে পায়। 

তরঙ্গ দৈর্ঘ্য যদি দৃশ্যমান আলোর সবচেয়ে ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকেও ছোট হয় সেটা কে আমরা বলি আল্ট্রা ভায়োলেট আলো। আরো ছোট হলে এক্সরে। আরো ছোট হলে গামা রে যেটা তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে বের হয়। আবার তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি দৃশ্যমান আলোর সবচেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকেও বড় হয় সেটাকে আমরা বলি ইনফ্রারেড। আরো বড় হলে মাইক্রোওয়েভ। আরো বড় হলে রেডিও ওয়েভ। পদার্থবিজ্ঞান শিখতে হলে যে বিষয়গুলো জানতে হয় বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের এ বিভাজনটি হচ্ছে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।ইনফ্রারেড আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি বলে আমরা খালি চোখে দেখতে পাইনা। 

টেলিভিশনের রিমোট কন্ট্রোল করার ইউনিট থেকে ইনফ্রারেড আলো বের হয় বলে আমরা সেখান থেকে আলো বের হতে দেখি না। এটিকে মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে দেখতে পারো কারণ মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তোলার জন্য সিসিডি নামে  এক ধরনের আলোক সংবেদনশীল আইসি ব্যবহার করা হয় সেগুলো দৃশ্যমান আলোর সাথে সাথে খানিকটা ইনফ্রারেড আলো দেখতে পারে।

আলোর প্রতিফলন

যখনই এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে আলোকে পাঠানো হয় তখনই আসলে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা ঘটে। তার একটি হচ্ছে প্রতিফলন। অন্যটি হচ্ছে প্রতিসরণ আর শোষণ। প্রথম থেকে দ্বিতীয় মাধ্যমে যাবার সময় খানিকটা আলো আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে সে টার নাম হচ্ছে প্রতিফলন। খানিকটা আলো দ্বিতীয় মাধ্যমে ঢুকে যেতে পারে সেটা হচ্ছেঃ প্রতিসরণ আবার খানিকটা আলো শোষিত হয়ে যায় সেটার নাম হচ্ছে শোষণ। সাধারণভাবে তরঙ্গের যাওয়ার জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন হয় কিন্তু আলোর বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চুম্বক ক্ষেত্রের তরঙ্গ তাই এটার জন্য কোন মাধ্যমের দরকার নেই। আলো তার বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ তৈরি করে নিজেরাই চলে যেতে পারে। কাজেই প্রতিফলন প্রতিসরণ ব্যাখ্যা করার জন্য যখন প্রথম এবং দ্বিতীয় মাধ্যম এর কথা বলা হয়েছে তখন একটি মাধ্যম আসলে শূন্য মাধ্যম হতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা কাচ বা পানিতে আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের উদাহরণ গুলো দেখি সেখানে একটা মাধ্যম বাতাস অন্যটি কাচ কিংবা পানি। বাতাস এত হালকা মাধ্যমে সেটাকে শূন্য মাধ্যম ধরে নিলে এমন কিছু বড় ভুল হয়না।

আলোর প্রতিফলনের দুটি সূত্র রয়েছে। যথা :

প্রথম সূত্র: আপতন রশ্মি এবং লম্ব দিয়ে আমরা যে সমতল কল্পনা করে নিয়েছিলাম প্রতিফলিত রশ্মিটি সেই সমযতলে থাকবে।

দ্বিতীয় সূত্র: প্রতিফলন কোণ আপতন কোণের সমান।

শোষণ

আমাদের চারপাশের জগতের সৌন্দর্যের বড় একটা অংশ আসে বিভিন্ন রং থেকে। কিন্তু রংটি আসে কেমন করে? আমরা যখন সবুজ পাতার মাঝে একটা লাল গোলাপ ফুল দেখে সেটি কেন লাল? কিংবা তার পাতাটি কেন সবুজ ? বিষয়টা আরো বিস্ময়কর মনে হতে পারে যখন তোমরা দেখবে সবুজ আলোতে লাল ফুল টা কে দেখাবে কুচকুচে কালো। কিংবা লাল আলো সবুজ পাতা কে দেখাবে কুচকুচে কালো।

সাধারণ আলোতে আসলে আলোর সবগুলো তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে। রং যেহেতু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে তাই বলা যেতে পারে সেখানে সব রঙের আলোর রয়েছে। যখন সবগুলো রং থাকে তখন সেখানে আলাদাভাবে কোন রঙ দেখা যায় না তখন আমরা বলি বর্ণহীন কিংবা সাদা আলো। এ আলো যখন একটা লাল গোলাপ ফুলে পড়ে তখন গোলাপ ফুলটা লাল রং ছাড়া অন্য সব গুলো রং শোষণ করে নেয়। তাই যে আলো প্রতিফলিত হয় আমাদের চোখে পড়ে সেখানে লাল ছাড়া আর কোন রং থাকে না এবং গোলাপ ফুল টা কে মনে হয় লাল। ঠিক সেরকম সবুজ পাতাটাতে সব রং এসে পড়ে এবং পাতাটা সবুজ ছাড়া অন্য সব রং শোষণ করে নেয় তখন যে রংটা প্রতিফলিত হয় সেটাকে সবুজ ছাড়া অন্য কোন রঙের আলোর থাকে না বলে পাতাটিকে সবুজ দেখায়।

মসৃণ এবং অমসৃণ পৃষ্ঠে প্রতিফলন

আয়না কিংবা আয়নার মত মসৃণ পৃষ্ঠে আলোর সমান্তরাল রশ্মিগুলো প্রতিফলন এর পরেও সমান্তরাল থাকে কারণ প্রত্যেকটা রশ্মি প্রতিফলনের সূত্র মেনে আপতন কোণের সমান প্রতিফলন প্রতিফলিত হয় পৃষ্ঠাটি যদি না হয় তাহলেও প্রত্যেকটা রশ্মি প্রতিফলনের সূত্র মেনে চলে কিন্তু এক পৃষ্ঠা কোণে থাকে বলে প্রতিফলন এরপর আলোকরশ্মি গুলো ভিন্ন-ভিন্ন প্রতিফলিত হয় তখন প্রতিফলন এরপর আর আলোকরশ্মি গুলো সমান্তরালে থাকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

Post a Comment

0 Comments